মোহিত, বিস্মিত অপার

ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়। ব্রেনওয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য আর ‘ওয়েবগুরুর’ প্রতিষ্ঠাতা। এখানেই কি তাঁর পরিচিতি সীমায়িত? না নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রকৃতির মতো আমাদের সামাজিকতার বহুমাত্রিক অঙ্গে আর অঙ্গনে! নিছক শিক্ষাসংগঠনে, কিংবা আলোকচিত্রে, তথ্যচিত্রের নির্মাণে তাঁর মেধার বিস্তার ঘটলে তাঁকে নিয়ে অন্যরকম ভাবনার অবকাশ থাকত। তাঁর কর্মময়তা নিয়ে ভিন্নতর জিজ্ঞাসা আর জিজ্ঞাসার উত্তর খোঁজার প্রবণতা বিস্তৃত হত অন্যভাবে। নিখুঁত চিত্রশিল্পে তাঁর নিঃশব্দ প্রবেশ এবং সে প্রবেশের নির্মিত, বিনির্মিত নিদর্শন আমাদের বিস্ময়িত প্রশ্নের সম্মুখীন করে দিচ্ছে। ফাল্গুনী সংবাদপত্রের প্রচারবিভাগে একসময় কাজ করতেন। ওখানে তাঁর দক্ষতা নিজের আত্মশক্তির মতোই প্রশ্নতীত। ওই কাজের সরাসরি সংযোগ আর সাফল্য নিয়ে ডিজিটালের সংসার ছুঁয়ে তথ্যপ্রযুক্তিকে আত্মস্থ করে মানুষ গড়ার কারিগরে তাঁর মনোনিবেশও একধরণের শিল্পকৃতি।

সম্ভবত এই মন, এই সূক্ষ্ণতাবোধ চিত্রকর্মের মতো দুরহ নির্মাণে জড়িয়ে দিয়েছে তাঁকে। আমার একদা প্রতিবেশী ফাল্গুনীর চিত্রযাপন আজ তাঁকে নাগরিক কলকাতার বহুজনের, বহু গুণগ্রাহীর একজন স্বচ্ছ পড়োশির চেহারায় রূপান্তরিত করে তুলেছে। এই রূপ আর রূপান্তর নিয়ে ফাল্গুনীকে অনেকদূর যেতে হবে। এরকম সচেতন উল্লাসে অভ্যস্ত হয়ে উঠলে আমৃত্যু অনিঃশেষের পথেই হাঁটতে হয়। নিঃস্তার নেই। ক্যানভাস, বর্ণ, বর্ণিত বা বর্ণাতীত বিষয়আশয় ব্যক্তিকে, তাঁর সময়কে অনবরত ধাওয়া করতে থাকবে। চূড়ান্ত ব্যস্ততার ভিড়েও আনমনে তিনি সৃজনের কারক ও ধারক হয়ে উঠতে বাধ্য হবেন। এটাই শিল্পের আরেক স্বাভাবিক শর্ত।

ফাল্গুনীর শিল্পকর্মের প্রদর্শনীতে রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ

১৫ মার্চ থেকে গগনেন্দ্র শিল্পপ্রদর্শনশালায় ফাল্গুনীর একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। ভেবেছিলাম যাব। কলকাতার বাইরে যাবার হঠাৎ-তাড়া বঞ্চিত করল আমাকে। তবু ফাল্গুনী আমারই অনুরোধে তাঁর ক্যানভ্যাস পাঠিয়েছেন-যা চাক্ষুস করে আমি মোহিত, বিস্মিত অপার।

বাঙালির স্বভাবধর্ম, সে যেখানেই থাক না কেন, সনিষ্ঠ হলে সৃজনের জাদু তাঁকে একসময় পাকড়ে ফেলে। অবরুদ্ধ পরিবেশেও জেগে ওঠে তাঁর শিল্পসত্তা। ফাল্গুনীর শিল্পকর্মের অভিমুখ প্রমাণ করছে; তিনি যেমন বাঙালি, তেমনি আধুনিকতাময়, প্রকৃতিময়, স্বাস্থ্যময়, ঐতিহ্য সচেতন একজন বিশ্বনাগরিক। শুনেছি, কয়েকবছর আগে আইপেড-এ আঁকতে শুরু করেছিলেন। পরে অঙ্কনচত্বরে, শিল্পীর অন্তরেও বহুরঙের সমাবেশ ঘটতে থাকে ওবং এই পথেই চারপাশের বস্তু আর মানুষ এবং তাদের ভেতরের সঙ্গে বাইরের লেনদেন-এর ধারাবাহিক চিত্রায়ন ফাল্গুনীকে অবিরত, অবিরাম করে তোলে। নিয়মের ভেতরে অনিয়মের খেলাই কি তবে শিল্পীর নিয়তি? ফাল্গুনী দুঃসাহসী এবং নিয়ম-উন্মুখ। দীর্ঘদিন তাঁর এই উন্মুখতা দেখার সুযোগ হয়েছে। কিন্তু শব্দের আড়ালে, দৃশ্যের অন্তরালে তাঁর ভেতরে যে সক্রিয় নৈঃশব্দ আর সচল দৃশ্যায়ন সম্ভব, তা দেখে ভালো লাগছে। পরবর্তী একক প্রদর্শনীর অপেক্ষায় রইলাম। শিল্পের অঙ্গরাজ্যে তাঁর স্বায়ত্তশাসনের আকাঙ্খা পূর্ণ হোক। ভরে উঠুক ক্যানভাস, বিচিত্র রঙ আর অবয়বের কৌলিন্যে।

বাহার উদ্দিন

সম্পাদক, আরম্ভ পত্রিকা

কলকাতা

https://www.aramva.co/art-exhibition-0f-Brainware…

Leave a Reply

*